শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৯:১৯
আল্লাহর সব বিধানই প্রজ্ঞাভিত্তিক, হিজাবসহ তাঁর নির্দেশ মানা মুমিনের দায়িত্ব

হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ হাসান ফাতেমি-নিয়া বলেছেন, মহান আল্লাহ মানুষের জন্য যেসব বিধান নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো সবই তাঁর পরম প্রজ্ঞার ভিত্তিতে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কাওসার ইসলামি বিজ্ঞান শিক্ষা কমপ্লেক্সের উদ্যোগে ‘সহিফায়ে সাজ্জাদিয়াকে ভিত্তি করে নৈতিক ও জ্ঞানমূলক আলোচনা’ শীর্ষক ধারাবাহিক অনলাইন বৈঠকের ১৩তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ হাসান ফাতেমি-নিয়া।

ইমাম বাকির (আ.) ও ইমাম সাদিক (আ.)-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বক্তব্যের শুরুতে তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর সময়কার ঐতিহাসিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ইসলামী সমাজের চিন্তাগত দিকনির্দেশনা এবং আকিদাগত বিচ্যুতি মোকাবিলায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, ইমাম বাকির (আ.) ও ইমাম সাদিক (আ.)-এর যুগে ইসলামী ভূখণ্ডের ব্যাপক বিস্তার ঘটে এবং পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন চিন্তাধারা ও মতবাদ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে। এর ফলে বিভিন্ন মত ও চিন্তার মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়। জবর ও ইখতিয়ার—অর্থাৎ মানুষের কর্মে স্বাধীন ইচ্ছা আছে কি না—এমন বিভিন্ন আকিদাগত বিষয়ও তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

ফাতেমি-নিয়া বলেন, এ পরিস্থিতিতে মানুষ আগের চেয়ে বেশি ইসলামী জ্ঞান ও শিক্ষার প্রকৃত অর্থ জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ইমামত ও বেলায়াতের জ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজের চিন্তাগত দিকনির্দেশনা দেন। তাঁদের কাছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করেন।

ইমাম সাদিক (আ.)-এর জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা
ইমাম সাদিক (আ.)-এর বৈজ্ঞানিক ও জ্ঞানগত মর্যাদা তুলে ধরে তিনি বলেন, আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন সূত্রেও ইমাম সাদিক (আ.)-এর বিস্তৃত জ্ঞানচর্চা ও তাঁর জ্ঞানগর্ভ শিক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বিশিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবু বাসির ও জাবির ইবনে হাইয়ানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ইমাম সাদিক (আ.)-এর জ্ঞান ও ব্যাপক প্রভাবকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তাই বিভিন্ন মত ও গোষ্ঠী তৈরি করে আহলে বাইত (আ.)-এর প্রকৃত শিক্ষার পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, এর মধ্যে মুহাম্মাদ হানাফিয়াকে ইমাম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাও ছিল। অথচ মুহাম্মাদ হানাফি নিজেই ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ইমামত স্বীকার করেছিলেন। একইভাবে জাইদিয়া ধারার উত্থান ঘটে। তবে জাইদ ইবনে আলী (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নামে যে মতবাদ পরিচিত হয়, তা এক বিষয় নয়।

বিশুদ্ধ নববী হাদিস প্রচারে ইমাম সাদিক (আ.)-এর ভূমিকা
ফাতেমি-নিয়া এসব কর্মকাণ্ডকে মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টি এবং মানুষকে আহলে বাইত (আ.)-এর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সে সময় একদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস প্রচার ও বর্ণনায় বাধা দেওয়া হচ্ছিল, অন্যদিকে হাদিস জাল ও বিকৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এর বিপরীতে ইমাম সাদিক (আ.) বিশুদ্ধ নববী হাদিস প্রচার ও বর্ণনার মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জ্ঞান ও আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হেদায়াতের নিয়ামতের শোকর হলো সঠিক পথ অনুসরণ করা
ইমাম সাদিক (আ.)-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ তখনই আল্লাহর নিয়ামতের প্রকৃত শোকর আদায় করতে পারে, যখন সে অন্তর থেকে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে উপলব্ধি করে এবং তার মূল্য অনুধাবন করে।

তিনি শোকরের অন্যতম অর্থ হিসেবে সঠিক হেদায়াতের পথ অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন,

 قُلْ لَا أَسْأَلُکُمْ عَلَیْهِ أَجْرًا إِلَّا مَنْ شَاءَ أَنْ یَتَّخِذَ إِلَیٰ رَبِّهِ سَبِیلًا

অর্থ: “বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না; তবে যে তার প্রতিপালকের দিকে যাওয়ার পথ অবলম্বন করতে চায়, সে তা করতে পারে।”

তিনি বলেন, হেদায়াতের নিয়ামতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শোকর হলো আল্লাহর পথকে চেনা এবং সেই পথেই এগিয়ে চলা।

অন্য একটি আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,

 قُلْ لَا أَسْأَلُکُمْ عَلَیْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِی الْقُرْبَی

অর্থ: “বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, শুধু নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা চাই।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি মাওয়াদ্দাত বা ভালোবাসা শুধু অন্তরের অনুভূতি নয়; বরং আল্লাহর নির্ধারিত পথ বেছে নেওয়া এবং তাঁর পথে চলার মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটতে হবে।

তাকওয়ার পথে গুনাহ থেকে দূরে থাকা জরুরি
সবর ও ওয়ারা সম্পর্কে তিনি বলেন, সবরের অন্যতম প্রকাশ হলো গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং তা পরিহার করা। আর ওয়ারা এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ শুধু গুনাহ করা থেকে বিরত থাকে না; বরং গুনাহের সীমানার কাছেও যায় না এবং নিজেকে তা থেকে দূরে রাখে।

তিনি বলেন, এ দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়ারা তাকওয়া ও আত্মসংযমের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মর্যাদা।

হিজাবের বিধানও আল্লাহর প্রজ্ঞার ভিত্তিতে
আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর গুরুত্বারোপ করে ফাতেমি-নিয়া বলেন, আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ হাকিম বা পরম প্রজ্ঞাময়। তিনি কোনো বিধানই প্রজ্ঞা ছাড়া দেন না। তাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সব বিধানই তাঁর প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলা।

হিজাবের বিষয়ে তিনি বলেন, হিজাবসহ অন্যান্য ঐশী বিধানের পেছনেও আল্লাহর প্রজ্ঞা রয়েছে। মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ গ্রহণ করা এবং তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্য করা—এমন ক্ষেত্রেও, যখন সে কোনো বিধানের অন্তর্নিহিত সব প্রজ্ঞা ও কল্যাণ পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না। প্রকৃত প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি,

 لَا مُؤَثِّرَ فِی الْوُجُودِ إِلَّا اللَّهُ অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া অস্তিত্বজগতে প্রকৃত প্রভাব বিস্তারকারী কেউ নেই”—এই তাওহিদি নীতির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তাওহিদের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং জগতে প্রকৃত প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর—এই বিশ্বাস মানুষের জীবনকে আল্লাহর ওপর আস্থা, তাঁর ইবাদত এবং তাঁর হেদায়াত অনুসরণের দিকে পরিচালিত করতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha